সেদিন পৃথিবী নতুনভাবে জন্মেছে

0

বলতে পারেন, ইতিহাসের কোন মহিমান্বিত দিনটি মানবতার তরফ থেকে সর্বোচ্চ মান-মর্যাদা ও ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার অর্ঘ্যে সংবর্ধিত হয়ে থাকার গুরুত্ব রাখে? কোন দিনটি চিরন্তন, শাশ্বত ও চির দীপ্তিমান?

বলতে পারেন, কোন দিনটিকে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া এবং মনোজ্ঞভাবে বরণ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে জাত-গোত্র, বংশ-বর্ণ ও শ্রেণিভিন্নতা এবং আগ্রহ-ঐকান্তিকতা ও চিন্তাধারা, দর্শনের বৈচিত্র্য সত্ত্বেও মানবকুল মিলে-মিশে শরিক হয়?

বলতে পারেন, কোন মাহেন্দ্র দিনটি নতুন পৃথিবীর জন্মদিন ও সৌভাগ্যপ্রসন্ন যুগের অবতরণিকা বলে গণ্য করা হয়? মন্দের ওপর কল্যাণ ও দুষ্টের ওপর শিষ্টের বিজয়চিহ্ন তুলনা করা হয়? কোন দিনটিকে দুর্ভাগ্য-নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা-পৈশাচিকতার ওপর ন্যায়নিষ্ঠ, সাম্য-সম্প্রীতি ও মমতা-সৌহার্দ্যের জয়ের প্রতীক সাব্যস্ত করা হয়? বুনো-পাশবিক ধর্ম-কর্ম ও অনৈতিক নিয়ম-নীতির ওপর সুসংহত ও সুগঠিত জীবনশৈলী এবং মানবতাঘনিষ্ঠ স্বয়ংসম্পূর্ণ ধর্মব্যবস্থার বিজয়োল্লাসের নমুনা হিসেবে মান্য করা হয়? কোন দিনটি মূর্খতা ও অন্ধকারের ওপর জ্ঞান-অভিজ্ঞান ও ঈমানের শুচিতালোকিত বিজয়ের অনির্বাণ স্মারক হিসেবে ধর্তব্য হয়?

বলতে পারেন, কোন মাহাত্ম্যপূর্ণ দিনে অনিষ্টের মোকাবেলায় নতুন অসীম শক্তিমত্তা সৃষ্টি হয়েছিল? যাতে মানবতাকে ঈমান-আমল, সত্কর্ম-বন্দেগি, তাকওয়া-পরহেজগারি ও মানবসেবার আলোকে সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা উপহার দেওয়া যায়? যে সমাজব্যবস্থার সদস্যদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘যাঁদের মাঝে নেই বিন্দু পরিমাণ কৃত্রিমতা, যাঁদের হৃদয়মানস সর্বাধিক নিষ্কলুষ-ঝকঝকে ও পবিত্র, যাঁরা সবচেয়ে বেশি জ্ঞান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন। ’ যাঁরা মানবতাকে প্রাচীন অন্ধকার যুগ থেকে নতুন জ্যোতির্ময় ও বিভাময় যুগে অভিষেক করাতে সদা প্রাগ্রসর ছিলেন।

স্বজাতির পূজা-অর্চনা থেকে মানবতাকে মুক্তি দিয়ে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির স্রোতধারায় যুক্ত করতে প্রতিনিয়ত ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ছিলেন। ছিলেন মানবসমাজকে পার্থিব ক্ষুদ্রায়তন ও সংকীর্ণতা থেকে নেহাত প্রশস্ততার দিকে ধাবিত করতে নিরন্তর সচেষ্ট। সর্বোপরি মানবতার আশিস-কল্যাণ কামনায় যাঁরা নিজেদের জীবন-যৌবন, যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা, বিত্তবৈভব, সুখ-বিলাসিতা, প্রাচুর্য-ঐশ্বর্য সব কিছু সঁপে দিয়ে হয়েছিলেন তৃপ্ত ও আনন্দমুখরিত। বলতে দ্বিধা নেই, এ অবিরাম অভিযাত্রায় তাঁরা শত বিপদ-দুর্বিপাক ও ক্ষতি-অনিষ্ট, বাধা-বিপত্তি ও সংগ্রাম-প্রতিবাদের শিকার হয়েছেন। তবু অহর্নিশ নিজেদের মহান ব্রতের প্রতি তাড়িত ও আত্মসমর্পিত ছিলেন। কোনো ধরনের শত্রুতা, দ্বন্দ্ব কিংবা বন্ধুত্বের সম্পর্ক দমাতে পারেনি কল্যাণের প্রতি তাঁদের পথচলা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তারা মুমিনদের প্রতি বিনয়, নম্র ও কাফিরদের প্রতি কঠোর, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করে না। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৫৪)

বলতে পারেন, কোন মহান দিনে মানবতার আশা-প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ-অভিলাষ স্বপ্নমেদুরতার ছোঁয়ায় নতুনত্ব পেয়েছিল? রাশি রাশি অপরাধ-গুনাহ ও নৈরাশ্য-ব্যর্থতায় আপাদমস্তক আবৃত, জ্ঞানের দৈন্য ও সঠিক আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বুদ্ধি-চপলতার শিকার এবং সভ্যতা-সংস্কৃতিবিধ্বংসী ও মানবতাবিধ্বংসকারী সহস্র কর্মকাণ্ডে ক্লিষ্ট পৃথিবীর প্রতিটি নগর-প্রান্তরের মানব সদস্যদের ওপর কোন দিন সত্যের ফুলসজ্জা দ্যুতি ছড়িয়েছিল? যেদিনের আগে মানুষজনের বিচূর্ণ অবয়বে ছড়িয়ে পড়েছিল ভবিষ্যতের ব্যাপারে হতাশা ও বিমর্ষতা! তারা হারিয়ে বসেছিল পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকার ও টিকে থাকার ন্যূনতম উপযুক্ততা ও যোগ্যতা! পরিপ্রেক্ষিতে হয়েছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে নগদ শাস্তির মুখোমুখি এবং মানব প্রজন্ম বিলুপ্ত হওয়ার সম্মুখীন?

বলতে পারেন, কোন দিনের সূর্যোদয়ের মাধ্যমে মানবতা নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার এবং জীবনের পরিধি সুপরিব্যপ্ত ও দীর্ঘায়িত করার যোগ্যতা অর্জন করেছিল? নৈতিকতায় স্নিগ্ধ ধ্রুপদি সভ্যসমাজ বিনির্মাণের মাল-মসলা পেয়েছিল? কল্যাণ-ভব্যতা, শিষ্ট-সুস্থতা ও উন্নত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তাৎপর্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর কোন দিন আবার সেগুলোতে প্রাণপ্রবাহ সঞ্চার হয়েছিল?

বলতে পারেন, কোন দিনটি মানুষের কাছে মানুষের মান-মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছিল? জালিম-অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করে মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর যুগান্তকারী শিক্ষা দিয়েছিল?

উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর জবাব যদি আমরা জানতে চাই, তাহলে কোনো ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংকোচ-জড়তা ছাড়াই অকপটে উত্তর দিতে হবে—‘এ হলো সেদিন, যেদিন গোটা বিশ্বকে আলোকিত করে, শুদ্ধতার আতরে সুবাসিত করে মহানবী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ’

এই দিনে মানবতা যুগ-যুগান্তরের ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া ঈমান-বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল।

************************************বিজ্ঞাপন************************************

************************************************************************************

এ পৃথিবী সৃষ্টির প্রতি ও নিজেদের স্বকীয়তার প্রতি আস্থা-বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল। মনোজগতে ভবিষ্যতের ব্যাপারে আজন্ম নৈরাশ্য জেঁকে বসার পর আশার শিখা দেখতে পেয়েছিল। জীবনকে ঘুণেপোকা ধরার ও প্রবৃত্তির অন্ধ পূজার কৃষ্ণ গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার পর নিজের শেষ পরিণতি এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের প্রতি ঈমান ফিরে পেয়েছিল।

যেসব পেশাদার মিথ্যাবাদী মানুষের ধন-সম্পদ লুটে খায় এবং মানুষকে আল্লাহর পথে গমন থেকে প্রতিরোধ করে, তারা নবী-রাসুলদের আনীত ধর্মের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর মানুষজন সেসব ধর্মের প্রতি নতুন করে এই দিনে ঈমান এনেছিল। বিভিন্ন জড়বস্তু—পাথর-প্রস্তর, গাছপালা, নদী-পর্বত, জন্তু, পশু, রাজা-বাদশাহ, আমির-উজির, বিত্তবান-ধনকুবের ও ক্ষমতাধরদের কাছে নিজের মান-সম্মান বিকিয়ে দেওয়া ও লাঞ্ছিত হওয়ার পর মানুষ নিজের আত্মমর্যাদা ও মান-সম্মানের প্রতি বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল। মানবতা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে ‘এই বিশ্ব তার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকওয়াবিহীন কোনো অনারবির ওপর কোনো আরবির কিংবা কোনো আরবির ওপর কোনো অনারবির মর্যাদা নেই। প্রত্যেকেই আদমের সন্তান; আর আদম একজন মাটির তৈরি মানুষ। ’

আরো বিশ্বাস করেছিল যে বাস্তবিকই প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর কিছু অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে। প্রত্যেককে নিজেদের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। কিন্তু অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিনম্র-সজ্জন ও উপভোগের ক্ষেত্রে হতে হবে মধ্যপন্থী। নিজের দায়িত্ব বা গুরুভার আদায়ের ক্ষেত্রেও হতে হবে অত্যন্ত চৌকস ও তুঙ্গস্পর্শী। হাদিসের ভাষায়—‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। ’

তাঁর আগমনে মানুষ বিশ্বাস করেছিল, নারীরা পুরুষের সহোদরা। তারা একে অপরের প্রতি সদাচরণ করতে বাধ্য। পাশাপাশি রাসুল (সা.) ভারসাম্যপূর্ণ যেসব শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দিকনির্দেশনা নিয়ে এসেছেন, সেগুলোর প্রতি তারা বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করে। আরো বিশ্বাসে প্রদৃপ্ত হয়ে ওঠে যে রাসুলের আনীত সেই ঐশী দিকনির্দেশনার আলোকেই পবিত্র মদিনায় গড়ে উঠেছে সুস্থ-সঠিক ও কল্যাণমুখর সমাজব্যবস্থা, যার উপমা সারা বিশ্বের কোথাও নেই। বিশ্বাসে আরো ঋদ্ধ হয়েছিল যে সেই দিকনির্দেশনা কেন্দ্র করেই যুগ-যুগান্তরে পৃথিবীর প্রতিটি নগর প্রান্তরে শান্ত-সুনিবিড়, সমৃদ্ধ ও জ্যোতির্ময় সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন এমন একটি নতুন জাতিগোষ্ঠীর জাগরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, যে জাতি নিজেকে দাওয়াতের জন্য উৎসর্গ করবে। নিজের জীবনের সঙ্গে দাওয়াতি কর্মকাণ্ডের স্থায়ী বন্ধন তৈরি করবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, তোমাদের মানবতার কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করবে। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০)

এটিই হলো নতুন বিশ্ব। রাসুলের আগমনে এই বিশ্বেরই জন্ম হয়েছে। যেখানে মানুষ আনন্দভরে স্বাধীনতা ও সাম্যের আবহে বসবাস করে। প্রাচীন বিশ্বে যেসব অধিকার থেকে মানুষ বঞ্চিত ছিল, সেসব অধিকার নিয়ে অপার্থিব আহ্লাদের সঙ্গে জীবন যাপন করে। যে বিশ্বে সভ্যতা-সংস্কৃতি উত্তরোত্তর উত্কর্ষের শিখরে পৌঁছে।

এটিই নতুন বিশ্ব। যেখানে আরবরা নবজীবন পেয়ে বিশ্বের নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তাদের এত শান্তি-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ-মর্যাদা উপভোগের রহস্য হলো—তাদের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্ক শুধু ইসলাম ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অছিলায়। তাদের উত্থান শুধু রাসুলের আগমনের পর। তাঁর আবির্ভাবের পর।

আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা অনুভব করতে পারি না, আমরা যে মাহাত্ম্যপূর্ণ সৌভাগ্যের সুফল দিব্যি ভোগ করছি, যে রঙিন ফুলেল জগৎ পেয়েছি, তার মূলে রয়েছে পৃথিবীর উদয়াস্ত পরিবর্তনকারী একটি মহিমান্বিত ঘটনা। সেটি হলো, বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত ও সব নবী-রাসুলের ইমাম হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বরকতপূর্ণ জন্মগ্রহণ।

দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, সেদিনকে স্মারক করে মানবতা গর্ব-উচ্ছ্বাস ও আনন্দ-হিল্লোলে আপ্লুত হয়ে এবং গোটা অস্তিত্ব আবেগের আবেশে মোহিত হয়ে বাঙ্ময় শৈলী ও সৌকর্যপূর্ণ ভাষায় গাইতে পারে :

‘উলিদাল হুদা ফাল কা-ইনাতু দ্বিয়াউ; ওয়া ফামুয যামানি তাবাস্সুমুন ওয়া সানাউ’—অর্থাৎ : ‘সত্যের জন্মে বিশ্বমণ্ডল হয়েছে আলোক-উদ্ভাসিত; কালের ঠোঁটে শোভা পেয়েছে বন্দনাস্তুতি ও হাসি সুস্মিত। ’

লেখক : বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তক ও দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা লখনউর সাবেক রেক্টর।

‘আত-তারিক ইলাল মাদিনাহ’ নামক আরবি গ্রন্থ থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

Leave A Reply